চর্যাপদ ও প্রাচীন যুগ সম্পর্কে যা জানতেই হবে | বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন | BCS, Primary, Govt Job
FULL TRANSCRIPT
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে তো আমরা সাধারণত
তিনটে বড় ভাগে ভাগ করি তাই না? প্রাচীন,
[মিউজিক] মধ্য আর আধুনিক যুগ।
>> হুম।
>> কিন্তু এই যে প্রাচীন যুগ এর শুরুটা ঠিক
কোথায়? এটা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে যা
মতভেদ মানে রীতিমত যুদ্ধ লেগে যাওয়ার মত
অবস্থা।
>> একদম।
>> আজকের আলোচনায় আমরা ঠিক এই রহস্যটারই
একটু গভীরে যাব। আমাদের হাতে কিছু উৎস আছে
যা আমাদের বাংলা ভাষার একেবারে জন্মলগ্নে
নিয়ে যাবে। আর এই পুরো জার্নির কেন্দ্রে
আছে মাত্র একটা বই চর্যাপথ। ঠিক তাই। আর
ব্যাপারটা এমন যে ডক্টর মোহাম্মদ
শহীদুল্লাহ বলছেন প্রাচীন [মিউজিক] যুগ
শুরু 650 খ্রিস্টাব্দ থেকে।
>> 650 থেকে।
>> আবার ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়
বলছেন না 950 খ্রিস্টাব্দ থেকে।
>> মানে প্রায় 300 বছরের ফারাক।
>> 300 বছরের ফারাক। এই বিতর্কটাই কিন্তু
বিষয়টাকে দারুণ মজার করে তোলে। কারণ এই
বিশাল সময়কালের মানে প্রায় 500 600
বছরের সাহিত্যিক প্রমাণ হিসেবে আমাদের
হাতে আছে শুধু ওই একটাই পুথি।
>> ভাবা যায়। একটা মাত্র সূত্র দিয়ে একটা
গোটা যুগের রহস্যভেদ করতে হবে।
>> একেবারে একটা ডিটেকটিভ স্তরীর মতো। তাহলে
চলুন এই হাজার বছরের পুরনো কেসটা একটু সলভ
করার চেষ্টা করা যাক।
>> হুম।
>> আমাদের আজকের মিশন হলো কি এই চর্যাপদ?
কারা লিখেছিলেন এই কোডেড মেসেজগুলো? আর
সবচেয়ে বড় কথা হারিয়ে যাওয়ার প্রায়
হাজার বছর পর কিভাবে এই গুপ্তধন আমাদের
হাতে এসে পৌঁছালো। [মিউজিক]
>> আচ্ছা।
>> তো প্রথমেই একদম গোড়ার প্রশ্নে আসি। এই
যে আমরা চর্যাপদ চর্যাপদ বলছি জিনিসটা
আসলে কি? এটা কি কবিতার বই? গানের খাতা
নাকি কোন ধর্মীয় গোপন নির্দেশিকা?
>> আসলে তিনটি। চর্যাপদ হলো বৌদ্ধ সহজিয়া
সাধকদের লেখা কিছু গানের সংকলন।
>> ও গানের সংকলন?
>> হ্যাঁ। চর্যা শব্দের মানে হল আচরণীয় বা
সাধনার পদ। সহজ কথায় এগুলো একই সঙ্গে
উচ্চমার্গের কবিতা, আধ্যাত্মিক গান আবার
সাধনার গোপন সংকেতও বটে। আচ্ছা।
>> পাল আর সেন রাজাদের সময়ে এগুলো লেখা
হয়েছিল। মানে উপর থেকে দেখলে মনে হবে
সাধারণ কিছু কবিতা। কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে
আছে গভীর দর্শন।
>> আর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো এটা
লেখার প্রায় হাজার বছর পর খুঁজে পাওয়া
গেছে।
>> হাজার বছর পর।
>> মানে কেউ জানতই না যে বাংলা ভাষার প্রথম
নিদর্শন বলে কিছু একটা আদৌ আছে। এর
আবিষ্কারের গল্পটাই তো একটা আস্ত সিনেমা
হতে পারে।
>> অবশ্যই হতে পারে। আর এই সিনেমার নায়ক
হলেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।
হুম। [মিউজিক]
>> কিন্তু গল্পের শুরুটা তারও আগে। 1882 সাল
নাগাত রাজা রাজ লেন্দ্রলাল মিত্র তার একটা
বইতে [মিউজিক] বইটার নাম ছিল সংস্কৃত
বুদ্ধিস্ট লিটারেচার ইন নেপাল। সেখানে
তিনি প্রথম ইশারা দেন যে নেপালে এমন কিছু
পুরনো বৌদ্ধ পুথি থাকতে পারে। [মিউজিক]
তিনি কয়েকটার নামও উল্লেখ করেন।
>> তার মানে ডিটেকটিভ একটা ক্লু পেয়ে গেল।
>> একদম সেই সূত্রটাকেই আঁকড়ে ধরলেন
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। উনি বুঝতে পারছিলেন এই
পুথি গুলোর মধ্যে একটা বড় রহস্য লুকিয়ে
থাকতে পারে তিনি একবার নয় বেশ কয়েকবার
নেপালে গেলেন তখনকার দিনে নেপালে যাওয়াটা
কিন্তু আজকের মত [মিউজিক] সহজ ছিল না
>> না একেবারেই না
>> অনেক কাঠখর পুড়িয়ে অবশেষে 1907 সালে
তিনি নেপালের রাজদরবারের লাইব্রেরি থেকে
একসঙ্গে চারটে পুরনো পুঁথি উদ্ধার করেন
>> 1907 সালে
>> হ্যা ধুলোর আজ তরণের নিচে যে কি সম্পদ
লুকিয়ে ছিল তা হয়তো তিনিও তখন কল্পনা
করেননি
>> আর সেই চারটির মধ্যেই একটা ছিল চর্যাপদ।
>> ঠিক।
>> বাকিগুলো কি ছিল?
>> বাকি তিনটে পুথি ছিল অবহট্ট ভাষায় লেখা।
সরোহা পাদের দোহা, কৃষ্ণপাদের দোহা আর
ডাকার নবী সাহিত্য পরিষদ থেকে 1916 সালে
একটা বই বের করা হল। নাম দেওয়া হল হাজার
বছরের পুরানো বাংলা ভাষার বৌদ্ধগান ও
দোহা। আর এই বই প্রকাশের পরেই চারদিকে
হইচই পড়ে গেল। বাংলা ভাষার হাজার বছরের
পুরানো চেহারাটা প্রথমবার সবার সামনে এল।
>> তাহলে শাস্ত্রী মশাই নেপাল ডাস দরবার থেকে
এই পুথিটাতে যোগাড় করলেন। কিন্তু
কলকাতায় এনে যখন খুললেন তখন তো নিশ্চয়ই
[মিউজিক] মাথায় হাত।
>> একদম।
>> এ তো আজকের বাংলার মতো দেখতে নয়। এখানকার
শব্দ বাক্য গঠন সবই তো হচ্ছে না। এই
অদ্ভুত ভাষার রহস্যটা ভাঙ্গা হলো কিভাবে?
>> এখানেই তো আসল চ্যালেঞ্জটা শুরু হলো।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নিজে এর ভাষার একটা
চমৎকার নাম দিয়েছিলেন, সান্ধ ভাষা।
>> সান্ধ ভাষা।
>> হ্যাঁ। বা আলো আধারী ভাষা। এটাকে একটা
কোডেড ল্যাঙ্গুয়েজের মতো ভাবতে পারেন।
>> আচ্ছা। [মিউজিক]
ধরুন পদে বলা হচ্ছে নৌকা নিয়ে নদী পার
হওয়া। বাইরে থেকে মনে হবে এটা একটা
সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এর ভেতরের মানে হল
দেহরূপ নৌকা দিয়ে সাধনার নদী পার হয়ে
নির্বাণ লাভ করা।
>> প্রত্যেকটা সাধারণ শব্দের আড়ালে একটা
গভীর আধ্যাত্মিক সংকেত লুকানো। বাহ মানে
কবিরা এমনভাবে লিখতেন যাতে সাধারণ মানুষ
একটা মানে বুঝবে আর যারা সাধক তারা এর
ভেতরের আসল অর্থটা ধরতে পারবে বেশ রহস্যময়
>> একদম
>> কিন্তু অন্য গবেষকরা কি এই আলো আধারী
তথ্যটা মেনে নিলেন
>> পুরোপুরি নয় এখানে মূলত দুটো বড় শিবির
তৈরি হয়ে গেল একদিকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
একে [মিউজিক] আলো আধারী বা রহস্যের ভাষা
বলছিলেন যা এর আধ্যাত্মিক দিকটাকে তুলে
ধরে কিন্তু ভাষাবিদরা প্রশ্ন তুললেন এর
ভৌগোলিক উৎসটা কি? ভাষাটা কোন অঞ্চলের?
>> রাইট।
>> তখনই ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর মত
গবেষকরা বললেন, এটা শুধু বাংলা নয় এর
[মিউজিক] মধ্যে আসামের ভাষারও প্রভাব আছে।
তাই তিনি এর নাম দিলেন বঙ্গকামরূপী।
>> ওহ, বঙ্গকামরূপী।
>> আর শেষ পর্যন্ত বাংলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা
পেল কিভাবে?
>> সেই কৃতিত্বটা মূলত ডক্টর সুনীতি কুমার
চট্টোপাধ্যায়ের। [মিউজিক] তিনি তার
বিখ্যাত বই দি অরিজিন এন্ড ডেভলপমেন্ট অফ
দ্যা বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজে যা করলেন তা
এককথায় অবিশ্বাস্য।
>> কি করলেন তিনি?
>> উনি একেবারে ফরেনসিক পরীক্ষার মতো করে এর
ধ্বনি, শব্দ আর ব্যাকরণ বিশ্লেষণ করে
দেখালেন যে এর ডিএনএ টা খাদিস বাংলা।
>> বাহ
>> তিনি প্রথম সন্দেহাতিত ফাঁকে প্রমাণ করলেন
যে চর্যাপদী বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন।
>> ভাষার বৈশিষ্ট্যগুলো নিশ্চয়ই খুব অদ্ভুত
ছিল।
>> খুবই মজার। যেমন ধরুন তখন একবচন বা
বহুবচনের কোন আলাদা নিয়ম ছিল না।
>> তাই নাকি?
>> আবার স এই তিনটে স এর মধ্যে উচ্চারণে কোন
পার্থক্য করা হতো না। সবই প্রায় একরকম
শোনাতো।
>> আচ্ছা।
>> আর ছন্দটা ছিল মূলত পয়ার আর ত্রিপদীর মত।
যা আজকের দিনে আমরা মাত্রাবৃত্ত ছন্দের
মধ্যে ফেলি।
>> এর নাম নিয়েও তো একটা বিতর্ক আছে তাই না?
একেকজন একেক নামে দেখেছেন।
>> হ্যাঁ। নামের রহস্যটাও কম নয়। নেপালে যে
মূলপুথিটা পাওয়া গিয়েছিল তার ওপর লেখা
ছিল চর্যাচর্য বিনিশ্চয়
>> চর্যাচর্য বিনিশ্চয়
>> হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই নামটাই ব্যবহার
করেছেন। কিন্তু পরে ডক্টর প্রবোধচন্দ্র
বাকচি তিব্বতের একটা অনুবাদ খুঁজে পান।
>> সেই অনুবাদ দেখে তিনি বলেন আসল নামটা
হওয়া উচিত চর্যা আশ্চর্য বিনিশ্চয়। মানে
যা আশ্চর্য সব চর্যা বা আচরণ।
>> ইন্টারেস্টিং। তবে এখনকার বেশিরভাগ পন্ডিত
মনে করেন মূল সংকলনটার নাম সম্ভবত ছিল
চর্যাগীতিকোষ
>> আচ্ছা এবার আসা যাক সেইসব মানুষদের কথায়
যারা এই অসাধারণ পদগুলো লিখেছিলেন কারা
ছিলেন এই কবিরা তাদের সিদ্ধাচার্য বলা হতো
তাই না
>> একদম ঠিক তাদের বলা হতো সিদ্ধাচার্য মানে
যারা সাধনায় সিদ্ধি বা চরম জ্ঞান লাভ
করেছেন
>> তাদের সংখ্যানীয় পন্ডিতদের মধ্যে ছোটখাটো
ইখতেলাফ আছে ডক্টর মোহাম্মদ শহিদুল্লাহর
মতে কোভিদ সংখ্যা ছিল 23 জন আর পদ ছিল 50
টা।
>> আর অন্য মতটা
>> ডক্টর সুকুমার সেন মনে করেন কোভিদ সংখ্যা
24 জন আর পদ ছিল 51 টা।
>> মানে [মিউজিক] খুব বেশি পার্থক্য নয়।
>> না এ সামান্য পার্থক্যটুকু বাদ দিলে মূল
ছবিটা একই থাকে। আসলে পুথিটা তো অসম্পূর্ণ
অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাই এই ছোটখাট
মতভেদগুলো রয়ে গেছে।
>> আচ্ছা। এই কবিদের মধ্যে কি কোন স্টার বা
রকস্টার ছিলেন? মানে এমন কেউ যার পথগুলো
সবচেয়ে জনপ্রিয় বা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
>> রকস্টার তো বটেই। সেই সময়ের বেচারে
কানহোপা ছিলেন সুপারস্টার।
>> কানহোপা?
>> হ্যাঁ। [মিউজিক] সবচেয়ে বেশি মোট 13 টা
পদ লিখেছেন আর তার পদের মধ্যে একটা আলাদা
নাটকীয়তা আর তেজ ছিল।
>> বাহ।
>> কিন্তু আমার মতে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং
চরিত্র হলেন লুইপা। যিনি প্রথম পদ্মা
লিখেছেন
>> কেন? কি আছে তার পদে?
>> তিনি শুরুই করছেন এই বলে কা তরুবর পাঁচ
বিড়াল, চঞ্চল চিয়ে পৈঠা কাল।
>> এর মানে কি? [মিউজিক]
>> মানে শরীরটা হল একটা গাছের মত যার পাঁচটা
ডাল। আর চঞ্চল মনে কাল বা মৃত্যু প্রবেশ
করে। ভাবুন শুরুতেই এমন একটা শক্তিশালী
রূপক দিয়ে তিনি পুরো চর্যাপদের সুরটা
বেঁধে দিয়েছিলেন।
>> এক মিনিট। এটা তো দারুন ব্যাপার। চঞ্চল
মনে কাল প্রবেশ করে। এ কথাটা তো আজকের
দিনও 100 ভাগ সত্যি।
>> একদম। আমাদের এই যে সারাক্ষণ নোটিফিকেশন
ডিস্ট্রাকশন এর যুগ তাতে তো মন আরো বেশি
চঞ্চল। তার মানে হাজার বছর আগেও মানুষ একই
সমস্যায় ভুগ ছিল।
>> ঠিক এইখানে চর্যাপদের প্রাসঙ্গিকতা। হাজার
বছর আগের মানুষের মনের ভ্রান্ততা আর আজকের
মানুষের মনের ভ্রান্ত মধ্যে খুব বেশি তফাৎ
নেই।
>> তবে চর্যাপদের কবিদের মধ্যে একজন [মিউজিক]
এমন একটা কথা বলে গেছেন যা সবকিছুকে
ছাপিয়ে যায়। তিনি হলেন ভূসুকুপা। হ্যাঁ
ইনার কথাই আমি বিশেষভাবে শুনেছি কারণ তিনি
নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দিয়েছিলেন এটা
তো অবিশ্বাস্য
>> ঠিক তাই আর এটা কিন্তু শুধু একটা শব্দ নয়
এটা একটা বিপ্লব ভাবুন সেই সময় মানুষের
পরিচয় ছিল ধর্ম বা অঞ্চল দিয়ে মগধের লোক
গৌরের লোক কিন্তু ভূসুকুপা তার 49 নম্বর
পদে লিখছেন আজই ভূসুকু বঙ্গালি ভৈলিও
ঘরেনি চন্ডালে লেলি এর মানে
>> অর্থাৎ আজ ভূসুকু বাঙালি হল তিনি নিজেকে
ভাষার পরিচয়ে বাঙালি বলছেন। এটা হলো
পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষা কেন্দ্রিক
জাতিসত্তার প্রথম দিকের একটা নিদর্শন।
>> তার মানে আমরা যেটাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ
বলি তার বীজটা হয়তো এই একটা লাইনের মধ্যেই
লুকিয়ে ছিল।
>> একেবারে হয়তো তিনি সচেতনভাবে জাতীয়তাবাদের
কথা ভেবে বলেননি। কিন্তু [মিউজিক] এই
শব্দটা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তিনি একটা
ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। ডক্টর
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করতেন ভূসুকুপা
সম্ভবত পূর্ববঙ্গের মানুষ ছিলেন।
>> চর্যাপদে কি কোন নারী কোভিদ সন্ধান পাওয়া
যায়?
>> হ্যাঁ। এটা চর্যাপদের আরেকটা দারুণ দিক।
কুক্কুরি পাকে চর্যাপদের একমাত্র নারী কবি
হিসেবে মনে করা হয়।
>> কুকুরিপা। তিনি তিনটি পদ রচনা করেছিলেন।
এছাড়া সবর পা, ডম্বিপা, ঢেনঢপার মতো আরো
অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি ছিলেন। গবেষকরা সব
মিলিয়ে প্রায় সাত জন কবিকে নিশ্চিতভাবে
বাঙালি বলে চিহ্নিত করতে পেরেছেন।
>> এই যে এত আধ্যাত্মিক কথা কোডেরড
ল্যাঙ্গুয়েজের বাইরে গিয়ে তাদের
দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কোন ছবি কি এই
পথগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়?
>> অবশ্যই। খুব স্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়।
[মিউজিক] এখানেই চর্যাপদের আসল সৌন্দর্য।
একদিকে যেমন গভীর দর্শন, তেমনি অন্যদিকে
সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, দারিদ্র্য,
সামাজিক রীতিনীতির প্রতিচ্ছবি। [মিউজিক]
>> যেমন,
>> যেমন ঢেঢ পা নামে একজন কোভিদ পদে তৎকালীন
সমাজের দারিদ্র্যের একটা হাড় কাঁপানো ছবি
ফুটে উঠেছে।
>> লাইনটা কি ছিল?
>> তিনি লিখেছেন, টালাতো মোড় ঘর নাহি পরে
পেশি। হাড়ি তো ভাত নাহি নীতি আবেশী।
>> এর মানে কি?
>> অর্থাৎ টিলার উপর আমার ঘর। কোন প্রতিবেশী
নেই। হাড়িতে ভাত নেই। অথচ প্রতিদিনই
অতিথি আসে।
>> ভাবুন একবার হাজার বছর আগের এক কোভিদ কলমে
কি অসম্ভব বাস্তব একটা [মিউজিক] ছবি। এটা
শুধু কবিতা নয় এটা একটা সামাজিক দলিল।
>> অবিশ্বাস্য। এর থেকে বোঝা যায় তাদের
জীবনযাত্রা কতটা কঠিন ছিল। আচ্ছা এই
পদগুলোর মধ্যে নাকি এমন কিছু প্রবাদ বাক্য
পাওয়া গেছে যা আমরা হয়তো আজও ব্যবহার
করি।
>> হ্যাঁ। মোট ছটা প্রবাদ খুঁজে পাওয়া গেছে।
আর সেগুলো শুনলে অবাক হতে হয় যে কথাগুলো
কতটা আধুনিক।
>> তাই? যেমন একটা হলো আপনা মংসে হরিনা বৈরি।
>> এর মানে তো নিজের মাংসই হরিণের জন্য শত্রু
হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রবাদটা তো আজও আমরা
ব্যবহার করি।
>> একদম।
>> বিশেষ করে যখন কেউ নিজের গুণের কারণেই
বিপদে পড়ে।
>> ঠিক। আরেকটা শুনুন। দুষ্ট গরুর চেয়ে
শূন্য গোয়াল ভালো। [মিউজিক] এটাও তো
আমাদের খুব পরিচিত।
>> হ্যাঁ। কর্পোরেট জগতের টক্সিক কলিগের
ক্ষেত্রে এটা প্রায়ই ব্যবহার করা হয়।
ভাবা যায় হাজার বছর ধরে কনসেপ্টটা একই
রয়ে গেছে।
>> বিলকুল। আরো একটা আছে হাতের কাকন দেখার
জন্য আয়নার প্রয়োজন হয় না।
>> মানে যা স্পষ্ট তা প্রমাণ করার দরকার নেই।
>> একদম এই প্রবাদগুলো প্রমাণ করে [মিউজিক]
যে আমাদের ভাষার শিকড় কতটা গভীরে আর কতটা
শক্তিশালী?
>> তাহলে চর্যাপদ হলো প্রাচীন যুগের একমাত্র
লিখিত সাহিত্যিক নিদর্শন। এর বাইরে কি আর
কোন কিছুর কথা জানা যায়? মানে সেই সময়ের
মানুষেরা আর কি বলতো, কি ভাবতো কোন লোক
কথার মত কিছু? সরাসরি লিখিত সাহিত্য না
হলেও ডাক ও খোনার বচনকে এই সময়ের
কাছাকাছি রচনা বলে ধরা হয়।
>> ও ডাক ও খোনার বচন।
>> হ্যাঁ। এইগুলো মূলত লোক সাহিত্য যা
মানুষের মুখে মুখে ফিরিত। বিশেষ করে খনার
বচনগুলো ছিল অসাধারণ। পুরোটাই কৃষি,
আবহাওয়া আর জ্যোতিষ সংক্রান্ত জ্ঞান।
>> একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে।
>> যেমন খুব বিখ্যাত একটা বচন হল কলা, রুয়ে
না খেটোপাত, তাতেই কাপড়, তাতেই ভাত। হুম।
[মিউজিক]
>> এর মানে হলো কলা গাছ লাগানোর পর তার পাতা
কেটো না। কারণ ওই কলাগাছই তোমাকে সারা
বছরের খোরাক আর বস্ত্রের যোগান দেবে।
>> বাহ।
>> এটা তৎকালীন কৃষিভিত্তিক সমাজের জ্ঞানের
এক চমৎকার ব্যবহারিক উদাহরণ। [মিউজিক] কোন
বড় বই নয়, শহর ছড়ার মাধ্যমে প্রজন্ম
থেকে প্রজন্মান্তরে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া
হতো।
>> আর ডাকের বচন খনার বচনের সঙ্গে এর মূল
পার্থক্যটা কোথায়? ডাকের বচনে মানব
চরিত্র, নীতি, শিক্ষা আর জ্যোতিষের কথাই
বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। [মিউজিক] এগুলোকে
অনেকটা জীবনদর্শনের সূত্র বলা যেতে পারে।
>> যদিও এগুলো চর্যাপদের মতো লিখিত বা
মার্জিত সাহিত্য নয় কিন্তু প্রাচীন
বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের
বিশ্বাস আর চিন্তাভাবনা বোঝার জন্য এগুলো
অমূল্য সম্পদ।
>> তাহলে আজকের পুরো আলোচনাটা থেকে আমরা
বাংলা সাহিত্যের একেবারে ডিএনএ লেভেলে
পৌঁছে গেলাম। চর্যাপদের আবিষ্কারের সেই
ডিটেকটিভ গল্প থেকে শুরু করে এর কোডেড
ভাষা তার ভেতরের সমাজ আর দর্শন সব মিলিয়ে
হাজার বছর আগের এক অস্পষ্ট কিন্তু জীবন্ত
জগতের দরজা যেন খুলে গেল।
>> চর্যাপদ শুধু বাংলা ভাষার প্রথম বই নয়।
>> এটা হাজার বছর আগের বাঙালির মনের একটা
এক্সরে প্লেট।
>> এক্সরে প্লেট। বাহ।
>> এর আলো আধারী ভাষার আড়ালে যে জীবনবোধ যে
সামাজিক বাস্তবতার ছবি লুকিয়ে আছে তা আজও
আমাদের নাড়িয়ে দেয়। [মিউজিক]
>> ঠিক। একদিকে গভীর আধ্যাত্মিকতা আরেকদিকে
পেটের জ্বালা। এই দুইয়ের মেলবন্ধনই
চর্যাপদকে কালজয়ী করে রেখেছে।
>> আমাদের জন্য একটা ভাবনার বিষয় রেখে যাওয়া
যাক। যখন চর্যাপদের কবি ভূষুগুোপা নিজেকে
বাঙালি বলে পরিচয় দিচ্ছেন তিনি কিন্তু
ধর্ম বা অঞ্চলের ঊর্ধ্বে উঠে ভাষার একটা
পরিচয় তৈরি করছেন
>> একদম। সেই হাজার বছর আগে তৈরি হওয়া বাঙালি
পরিচয়ের সাথে আজকের দিনে আমাদের পরিচয়ের
যোগসূত্রটা ঠিক কোথায়? আর ভবিষ্যতে এই
পরিচয়ের চেহারাটা কেমন হতে
UNLOCK MORE
Sign up free to access premium features
INTERACTIVE VIEWER
Watch the video with synced subtitles, adjustable overlay, and full playback control.
AI SUMMARY
Get an instant AI-generated summary of the video content, key points, and takeaways.
TRANSLATE
Translate the transcript to 100+ languages with one click. Download in any format.
MIND MAP
Visualize the transcript as an interactive mind map. Understand structure at a glance.
CHAT WITH TRANSCRIPT
Ask questions about the video content. Get answers powered by AI directly from the transcript.
GET MORE FROM YOUR TRANSCRIPTS
Sign up for free and unlock interactive viewer, AI summaries, translations, mind maps, and more. No credit card required.